ভারতের আইন পরিষদ ও ভারতের পার্লামেন্টের গঠন, ক্ষমতা , কার্যাবলী ব্যাখ্যা
ভারতের পার্লামেন্টের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী ব্যাখ্যা করতে পারবেন। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ (রাজ্যসভা ও লোকসভা) -এর মধ্যে পারস্পরিক সাংবিধানিক সম্পর্ক বুঝতে পারবেন। ভারতের পার্লামেন্টে 'আইন প্রণয়ন পদ্ধতি' সম্পর্কে জানতে পারবেন। ভারতের পার্লামেন্টে পার্লামেন্টারী কমিটিগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিতে পারবেন।
ভূমিকা
যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই আইনসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সুতরাং ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আইনসভার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে আইনসভা কেন্দ্র ও রাজ্যে এ উভয় কেন্দ্রেই আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদ হলো দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা। সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে ভারতের শাসন বিভাগ এবং আইন বিভাগকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণ গ্রেট ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য এবং পদ্ধতি অনুসরণে কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদের কাঠামোর প্রকৃতিগত বিন্যাস সাধন করেছেন। ভারতের সংবিধান ৭৯ নং ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, রাজ্যসভা এবং লোকসভা নিয়ে সংসদ গঠিত।
ভারতের আইনসভার গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী
লোকসভা ও রাজ্যসভা ভারতের আইনসভার ২টি কক্ষ। লোকসভা হচ্ছে নিম্নকক্ষ বা জনপ্রিয় কক্ষ এবং রাজ্যসভা হচ্ছে উচ্চকক্ষ।
রাজ্যসভার গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী
সংবিধানের ৮০ নং ধারায় রাজ্যসভার গঠন সম্পর্কে উল্লেখ আছে। এ ধারা অনুসারে অনধিক ২৫০ জন সদস্য নিয়ে রাজ্যসভা গঠিত হবে। এর মধ্যে ১২ জন রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য এবং ২৩৮ জন নির্বাচিত সদস্য। রাষ্ট্রপতি ১২ জনের কম সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন। মূলত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে রাষ্ট্রপতি ঐ সদস্যদের মনোনীত করেন। জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্য হতে বাকী ২৩৮ জন সদস্য নির্বাচিত হন। সাধারণভাবে প্রত্যেক রাজ্যের ৫০ লক্ষ লোকের মধ্যে ১০ লক্ষের জন্য ১জন সদস্য নির্বাচিত হন। পরে প্রতি ২০ লক্ষ লোকের জন্য ১ জন করে অতিরিক্ত সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা আছে। রাজ্যসভা সাধারণ বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে লোকসভার সমান ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আর্থিক বিষয়ে রাজ্যসভার বিশেষ কোন ক্ষমতা নেই। লোকসভা কর্তৃক গৃহীত বিল রাজ্যসভা প্রত্যাখান করতে পারে না। সরকার গঠন, তার কার্যকাল নিয়ন্ত্রণ ও অপসারণে এ সভার প্রকৃত কোন ক্ষমতা নেই। মন্ত্রীপরিষদ রাজ্যসভার নিকট দায়িত্বশীল নয়। রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীর অপসারণের ক্ষমতা এ কক্ষের আছে এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে রাজ্যসভা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করে।
আরো পড়ুন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলীয় ব্যবস্থা
লোকসভার গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী
লোকসভা হল সংসদের নিম্ন-পরিষদ এর জনপ্রিয় কক্ষ। এ কক্ষের সদস্যগণ প্রতক্ষ্যভাবে সার্বজনীন ভোটের দ্বারা গঠিত নির্বাচকমন্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত হন। মূল সংবিধানে উল্লেখ ছিল, লোকসভার সদস্যসংখ্যা ৫২৫ এর বেশি হবে না। এর মধ্যে ৫০০ জন বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হবেন এবং অনধিক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসাবে লোকসভায় নির্বাচিত হবেন। ১৯৭৩ সালে ৩১তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মোট সদস্য সংখ্যা করা হয় সর্বাধিক ৫৪৫ জন। যার মধ্যে অনধিক ৫২৫ জন বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধি, এখন এ সংখ্যা রাজ্যে ৫৩০ এবং কেন্দ্রে ১৩ এবং অনধিক ২০জন কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধি। রাজ্যের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় জনসংখ্যার অনুপাতে। লোকসভার কার্যকালের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বছর।
সরকার গঠনের ক্ষেত্রে একমাত্র ভূমিকা লোকসভার। লোকসভার যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারাই সরকার গঠন করে। সে হিসেবে মন্ত্রীসভা গঠনের দায়িত্ব তাদেরই, অনাস্থা এনে লোকসভায় বিরোধী দল সরকারের পতন ঘটাতে পারে। এভাবে লোকসভা মন্ত্রীসভা নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণ বিল সংক্রান্ত লোকসভার ক্ষমতা অনুমোদন ব্যতীত সরকারের আয়-ব্যয়ের প্রস্তাব কার্যকর করা যায় না। লোকসভার নির্বাচনমূলক ও অপসারণমূলক ক্ষমতা আছে। সংবিধান-সংশোধন সংক্রান্ত বিল, রাজ্যের ভৌগলিক সীমানা পরিবর্তন, নাম পরিবর্তন বা রাজ্য পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিল, জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য কোন প্রস্তাব, জরুরি অবস্থার মৌলিক অধিকার কার্যকর করার উপর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারীকৃত কোন আদেশ, রাজ্যে সাংবিধানিক অচল অবস্থা সংক্রান্ত ঘোষণার অনুমোদনের প্রস্তাব প্রভৃতি কার্যকর করা জন্য লোকসভার অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংবিধানিক সম্পর্ক
ব্রিটেনের দু'টি কক্ষের সম্পর্কের আলোকে ভারতে দু'টি কক্ষের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন সংবিধান প্রণেতাগণ। লোকসভাকেই তারা আইনগত দিক থেকে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। রাজ্যসভার ভূমিকা মূখ্যত অঙ্গ রাজ্যের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন এবং লোকসভার অবিবেচনাপ্রসুত ক্ষমতা প্রয়োগের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ। আইনগত দিক থেকে রাজ্যসভা লোকসভার অনুগত কক্ষে পরিণত হয়েছে। রাজ্যসভা লোকসভার নীরব সহযোগী। সরকার গঠন, সরকার নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক বিষয়ের উপর লোকসভার নিয়ন্ত্রণ রাজ্যসভার অস্তিত্বকে ম্লান করে দিয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো ক্ষেত্রে রাজ্যসভা লোকসভার সাথে সমান ক্ষমতা ভোগ করে।
আইনসভায় আইন প্রণয়ন পদ্ধতি
আইন প্রণয়ন হল আইনসভার প্রধান দায়িত্ব। সংসদে কোন বিল উত্থাপন করা হবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ক্যাবিনেট সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীগণ বিলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বক্তব্য পেশ করেন। ভারতের সংবিধান সাধারণ বিল এবং অর্থবিল ও অন্যান্য অর্থ সম্বন্ধীয় বিল সম্পর্কে ভিন্ন পদ্ধতি সংযোজন করেছে।
আরো পড়ুন: মার্কিন কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন পদ্ধতি
সাধারণ বিল
এ বিল পাশের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন মন্ত্রীগণ। নির্দিষ্ট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী যে কোন কক্ষে বিল উত্থাপন করেন। বিল পাশের ক্ষেত্রে কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। যথাঃ
বিলের প্রথম পর্যায়
মন্ত্রীকে প্রথমে বিল উত্থাপনের জন্য সভার অনুমতির প্রস্তাব পেশ করতে হয়। লোকসভায় স্পীকার এবং রাজ্য সভায় চেয়ারম্যান সভার নিকট অনুমতির জন্য প্রস্তাব পেশ করেন। অনুমোদন লাভের পর মন্ত্রী বিল উত্থাপন করেন এবং সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিলের ২য় পর্যায়
বিলের উত্থাপক সিলেক্ট কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। প্রস্তাব গৃহীত হলে তিনি কমিটির সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেন। রাজ্যসভা থেকে এক-তৃতীয়াংশ এবং লোকসভা থেকে কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নেয়া হয়। স্পীকার সভাপতি মনোনীত করেন।
৩য় পর্যায়
কমিটি পর্যায়ে বিলটি নিয়ে আলোচনা করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান এর শেষে সুপারিশসহ বিলটি সংশ্লিষ্ট কক্ষের নিকট প্রেরণ করেন।
৪র্থ পর্যায়
এ পর্যায়ে বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এবং সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা যায়। বিলের বিভিন্ন অংশের উপর আলোচনা এবং সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ-প্রত্যাখ্যান বা প্রত্যাখ্যানের শেষে বিলের ৪র্থ পাঠের পর্যায় অতিক্রান্ত হয়।
৫ম পর্যায়
এ সময় মৌখিক সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা যায়। প্রস্তাবক বিলটিকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব দেন। ঐ কক্ষে উপস্থিত এবং ভোটদানকারী সাংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে বিলটি গৃহীত হয়।
৬ষ্ঠপর্যায়
সংসদের ১টি কক্ষে বিলটি গৃহীত হবার পর অন্যকক্ষে প্রেরিত হয়। অন্য কক্ষ যদি বিলটিকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করে তবে বিলের ৬ষ্ঠ পর্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হয়।
ভারতের আইনসভার বিভিন্ন কমিটি
পদ্ধতি সংক্রান্ত এবং কার্য পরিচালনা সংক্রান্ত নিয়মাবলী অনুযায়ী লোকসভার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য ১২টি কমিটি আছে। প্রকৃতির দিক থেকে কমিটিগুলো বিভিন্ন ধরনের। এগুলো হলো:
- কার্য পরিচালনা বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি;
- নিয়মাবলী সংক্রান্ত কমিটি:
- আবেদন বিষয়ক কিমিট;
- সরকারী প্রতিশ্রুতি বিষয়ক কমিটি;
- অধিকার বিষয়ক কমিটি;
- বিল বিষয়ক সিলেক্ট কমিটি;
- লোকসভার বৈঠকে সদস্যদের অনুপস্থিতি বিষয়ক কমিটি;
- বেসরকারী বিল বিষয়ক কমিটি;
- অধস্তন আইন বিষয়ক কমিটি:
- আনুমানিক ব্যয় বিষয়ক কমিটি;
- সরকারী গাণিতিক কমিটি;
- • রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা সংক্রান্ত কমিটি;
- সংসদ সদস্যদের বেতন ও ভাতা বিষয়ক কমিটি
- তফসিলী জাতি ও উপজাতি কল্যাণ বিষয়ক কমিটি
- লাভজনক পদ বিষয়ক কমিটি।
সারকথা
রাষ্ট্রপতি রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ) ও লোকসভা (নিম্নকক্ষ) নিয়ে ভারতে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠিত। সংসদের নিম্নকক্ষ বা লোকসভা হচ্ছে জনপ্রিয় কক্ষ। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে। লোকসভা রাজ্যসভার তুলনায় অনেক বেশী ক্ষমতা ভোগ করে। প্রকৃতপক্ষে রাজ্যসভা, লোকসভার 'নিরব সহযোগী'। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিল বা আইনের খসড়া যেকোন কক্ষে (ক্যাবিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে) উত্থাপন করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে বিলটি গৃহীত হলে অন্য কক্ষে পাঠানো হয়। এ কক্ষে বিলটি সামগ্রিকভাবে গৃহীত হলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনসহ বিলটি আইনে পরিণত হয়। ভারতীয় আইন সভায় বিভিন্ন কমিটি কাজ করে।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url