জাপানের সংবিধানের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য
জাপানের সংবিধানের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য জাপানের রাজনৈতিক-সাংবিধানিক বিকাশ সম্পর্কে বলতে পারবেন। জাপানের বর্তমান সংবিধান (১৯৪৭ সালে প্রবর্তিত 'শান্তি সংবিধান')-এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করতে পারবেন, এবং জাপানের সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রকৃতি ও চরিত্র বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
ভূমিকা
জাপান এশিয়ার প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্র। জাপানের বর্তমান সংবিধান ১৯৪৭ সালে পূর্ববত্য শেহাজ সংবিধানের স্থলাভিষিক্ত হয়। এ সংবিধান দেশের শাসন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। জাপানের শাসন ব্যবস্থা অনেক পুরানো হলেও এর আগে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রণীত সংবিধানে গণতান্ত্রিক আদর্শ লক্ষ্যণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু বর্তমান সংবিধান দূরবর্তী ধ্যান-ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়ে এক নতুন জাপান সৃষ্টি করার কাজে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। জাপানের সংবিধান সম্পর্কে আমরা এখন বিস্তারিত আলোচনা করব।
আরো পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচার বিভাগ ও বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা
জাপানের রাজনৈতিক-সাংবিধানিক বিকাশ
জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু হয়েছিল ১৮৬৭-৬৮ সালে মেইজি রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাল থেকে। এর আগে ২৫০ বছরেরও বেশী সময় জাপানে টোকুগাওয়া গোষ্ঠীর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। মেইজি যুগে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটলেও নতুন কুলীনতন্ত্রের (New oligarchy) শাসন শুরু হয়। কিন্তু গণতন্ত্রী না হলেও তারা পরবর্তী গণতান্ত্রিক জাপান তৈরী করতে সহায়তা করেছিল। মেইজি রাজবংশের শুরুর ২০ বছর পর ১৮৮৯-৯০ সালে নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। এ ২০ বছরের অন্তবর্তীকালীন সময়ে অনেক রাজনৈতিক সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এগুলো হল, পুরাতন প্রতিষ্ঠানের স্থলে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সামুরাই ও টোকুগাওয়া গোষ্ঠীর অধিকার ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধাগুলোর উচ্ছেদ সাধন, পুরাতন জায়গিরগুলোর বদলে সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত শাসকদের দ্বারা পরিচালিত প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা, পুরানো ভূমিসত্ত্ব ব্যবস্থার অবসান, ব্যাপক গণশিক্ষার প্রবর্তন, বাধ্যতামূলক সামরিক বৃত্তি, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি, আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রভৃতির প্রবর্তন ইত্যাদি। এ সময় শিক্ষিত জাপানীদের একাংশ শক্তিশালী নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্যের জন্য কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। অন্য অংশ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। এদের নেতৃত্বেই ১৮৮০ সালে প্রথম রাজনৈতিক দল সংগঠিত হয়েছিল। এরই ধারাবহিকতায় পরবর্তীতে সংবিধান প্রণীত হয়। জাপানের জনগণ কোন আন্দোলনের মাধ্যমে এ সংবিধান লাভ করে নি বরং বলা হয়, এটি ছিল জনগণকে সম্রাটের 'অনুগ্রহের দান'। রাজবংশীয় ও উপজাতি বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জাপান সরকার চোসু গোষ্ঠীর নেতা প্রিন্স ইটো হিরোবুমিকে এ সংবিধান রচনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ইটো কিছুটা প্রশীয় মডেল অনুসারে এ সংবিধানের খসড়া তৈরী করেন। প্রায় দুই বছর ধরে গোপনে কাজ করে তৈরীকৃত এ খসড়া ১৮৮৮ সালে প্রিভি কাউন্সিলে পেশ করেন। জাপান সম্রাট এবং প্রিভি কাউন্সিল এ সংবিধানের কিছু পরিবর্তন করে তা অনুমোদন করে ১৮৮৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি।
১৯৪৫ সালে মিত্র শক্তির নিকট আত্মসমর্পনের মাধ্যমে জাপানের কর্তৃত্ব চলে যায় কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। দখলদারী কর্তৃপক্ষের ২টি উদ্দেশ্য ছিল- (১) গণতন্ত্রায়ণ ও (২) বেসামরিকীকরণ। এ দুইটি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এক নতুন সংবিধান রচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে জেনারেল ম্যাকআর্থার প্রথমে জাপানের যুবরাজকে এবং পরে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীকে পশ্চিমা উদারনীতির ধারায় একটি সংবিধান রচনার জন্য উদ্যোগ নেবার দায়িত্ব দেন। কিন্তু এঁরা কেউই তাঁর নির্দেশিত পথে সংবিধান রচনা করতে চান নি। ম্যাকআর্থার নিযুক্ত পরবর্তী মাৎসুমাতো কমিটিও অনুরূপ নীতি অনুসরণ করেছিল। পরে ম্যাকআর্থার তার দপ্তরের কর্মচারীদের এক মডেল সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন। প্রথম খসড়া প্রকাশিত হয় ৬ই মার্চ ১৯৪৬। ব্যাপক আলোচনার পর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে খসড়া সংবিধানটি ডায়েটে গৃহীত হয়। জাপান সম্রাট নতুন সংবিধান ঘোষণা করেন ১৯৪৬ সালের ৩ নভেম্বর এবং এটি চালু হয় ৩রা মে, ১৯৪৭ সালে। এ সংবিধানটি 'শান্তি সংবিধান' (Peace Constitution) বলে পরিগণিত হয়।
জাপানের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য
১৯৪৭ সালের সংবিধানে একটি প্রস্তাবনা, ১১টি অধ্যায় এবং ১০৩ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এ সংবিধানের বিশ্লেষণে প্রধান প্রধান যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা হলো:
১। জাপানের সংবিধানকে এক 'শান্তির দলিল' (Document of Peace) বলা হয়। বিশ্বের আর কোন রাষ্ট্রের সংবিধানের এরূপ নামকরণ করা হয় নি।
২। সংবিধানে জনগণের উপর সার্বভৌম ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। মুখবন্ধে বলা হয়- "আমরা জাপানী জনগণ ঘোষণা করছি যে, সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত এবং এ সংবিধান দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করছি"।
৩। 'শান্তিবাদ' জাপানী সংবিধানের মূলস্তম্ভ। সংবিধানের সকল জাতির সাথে সহযোগিতার লক্ষ্যে সকলের জন্য, সকল সময়ের জন্য শান্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ লক্ষ্যে ঘোষণা করা হয় যে, "স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং যুদ্ধের অন্যান্য বাহিনী কখনও পোষণ করা হবে না। রাষ্ট্রের যুদ্ধে লিপ্ত থাকার অধিকার স্বীকার করা হবে না"।
৪। সংবিধানে মানুষের মৌলিক অধিকারের চিরন্তন অলঙ্ঘনীয়তার কথা জোরালোভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সাথে জনগণকে এ সকল অধিকারের কোন রূপ অপব্যবহার হতে বিরত থাকতে সতর্ক করে দেয়া হয়।
৫। সম্রাটের ক্ষমতা হ্রাস করা হয় এ সংবিধানে। বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সম্রাটের সকল কাজে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন থাকতে হবে।
৬। জাপানে সংবিধানের প্রাধান্য ঘোষণা করা হয়। সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন।
৭। জাপানী সংবিধানে নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা পৃথক করে দেয়া হয় যাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ না ঘটে।
৮। সংবিধানে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা নীতি গ্রহণ করা হয়। সংবিধানকে সমুন্নত রাখার জন্য কোন আইন, আদেশ, বিধি বা সরকারী কার্য ব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা বিচারের ক্ষমতা সুপ্রীমকোর্টকে দেয়া হয়।
৯। জাপানের সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয়।
১০। জাপানী সংবিধানে ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতি গ্রহণের পাশাপাশি মন্ত্রীপরিষদকে আইনসভার নিকট দায়ী করা হয়। এতে ক্যাবিনেট ব্যবস্থার প্রাধান্য লক্ষ্য করা হয়।
১১। এ সংবিধানে স্থানীয় স্বশাসনের নীতি গ্রহণ করা হয়।
১২ জাপানের নতুন সংবিধানে নাগরিকদের ৩টি কর্তব্যের উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলঃ (ক) সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, (খ) কাজ করার দায়বদ্ধতা এবং (গ) কর প্রদানের দায়বদ্ধতা।
আরো পড়ুন: মার্কিন কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন পদ্ধতি
সংবিধানের প্রস্তাবনা
অনেক দেশের লিখিত সংবিধানের মতই জাপানেও প্রস্তাবনার মাধ্যমে সংবিধানের উদ্দেশ্য ও নীতি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রস্তাবনার শুরুতেই বলা হয়েছে "আমরা জাপানী জনসমাজ আমাদের যথাযথভাবে নির্বাচিত জাতীয় ডায়েটের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এ সংবিধান প্রতিষ্ঠা করছি।" এ ঘোষণার মাধমে ৩টি বিষয় লক্ষ্য করা যায়:
• জাপানী শাসন ব্যবস্থায় জনগণই চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস,
• সংবিধান রচয়িতাগণ জনগণের প্রতিনিধি ছিলেন এবং
• জাপানের জনগণের সম্মতিই ছিলো এ সংবিধানের ভিত্তি। বাস্তবে জনগণ বা জনগণের প্রতিনিধি সংবিধান তৈরীর কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন না। আমেরিকার চাপে এ সংবিধান তৈরী এবং ডায়েট কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল। এ কারণে অনেকে এ সংবিধানকে বিদেশী ভাষায় রচিত সংবিধানের জাপানী অনুবাদ বলে বর্ণনা করেছেন। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণ- প্রস্তাবনার এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাপানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় 'রাজকীয় সার্বভৌমত্বের' অবসান ঘটানো হয়েছে।
প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে। সরকার হলো এক পবিত্র 'অছি ব্যবস্থা' (a trusteeship) যার কর্তৃত্বের উৎস জনগণ এবং যার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন জনপ্রতিনিধিরা। এছাড়া 'সমস্ত জাতির সংগে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার ফলগুলো ও স্বাধীনতার আশীর্বাদ নিয়ে' তাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনগণের সংকল্পের কথা প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সম্রাটকে 'রাষ্ট্রের ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক' বলা হয়েছে। আইনী ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমতার নীতি, মৌলিক অধিকার এবং জংগীবাদের অবসানের কথাও প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সারকথা
এশিয়ার প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্র জাপানের বর্তমান সংবিধান প্রণীত হয় ১৯৪৭ সালে। এ সংবিধান স্থলাভিষিক্ত হয় মেইজি সংবিধানের। বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার অবসান। ঘটিয়ে এক পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মেইজি সংবিধান প্রণীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে জাপানের পরাজয়ের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কর্তৃত্ব চলে যায়। এরপর ম্যাকআর্থার কর্তৃক নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। গণতন্ত্রায়ণ এবং বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করার জন্য এ শান্তি সংবিধান-এ জনগণকে সকল শক্তির উৎস ঘোষণা করা হয়।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url